স্থবিরতার কাব্য

প্রস্তরমানুষ আমি, বুকে গাঁথা হয়
রক্তিম শিলালিপি, বয়ে যায় অনন্ত সময়
প্রতীক্ষায়

Friday, October 7, 2016

দেবীপক্ষের গল্পঃ ঘরে ফেরা

(০৭/১০/২০১৬) শেষ পর্যন্ত ছুটিটা পাওয়া গেল না।
গত এক মাস ধরে এই ছুটিটার জন্য বস্‌কে বলে আসছে নিখিলেশ। প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে ইন্ডিগোর টিকিটটা যেদিন কাটল, তার পরের দিন থেকেই। দেখছি দেখবো করে এড়িয়ে যাচ্ছিল বস্, আজ শিফট শেষে নিজের চেম্বারে ডেকে খোলাখুলি জানিয়ে দিল, হবে না।
অনেক কথা ওর মনে আসছিল, কিন্তু শেষ অবধি চুপ থেকেই বাইরে চলে এল। বলে কোনো লাভ নেই।
অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের মোড়টা পর্যন্ত হেঁটে এল নিখিলেশ। গলা থেকে ‘সি.ই.সি. কন্সট্রাকশন’ লেখা আইডি-টা খুলে ব্যাগে ঢোকাল, হাত দেখিয়ে উঠে পড়ল একটা অটোয়।
—‘ আন্ধেরি স্টেশন।’
চাকরিটা কি ছেড়ে দেবে? ভাবছিল ও। জয়েন্টে ওর যত র‌্যান্ক হয়েছিল, ওদের গ্রামে এরকম ভালো র‌্যান্ক আগে কেউ করেনি। যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এল, কত স্বপ্ন ছিল সেসময়। গ্রাজুয়েট হবে, তারপর বিদেশে যাবে, মাস্টার্স করবে; কোনো মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেটে উঁচু পোস্টে জয়েন করবে, নয়তো আরও পড়বে, কোনো ভালো ইউনিভার্সিটির স্কলার হবে—এমনটাই ভাবত ফার্স্ট ইয়ারে । শুধু স্বপ্ন দেখাই নয়, তার জন্য পড়াশোনাও তো কম করেনি। অন্যরা যখন ক্লাস পালিয়ে সিনেমা দেখতে গেছে, কিংবা শনি-রবি-সোম টানা তিনদিনের ছুটি পেয়ে বেড়াতে গেছে দীঘা, ও তখন ঘাড় গুঁজে বসে পাতার পর পাতা অ্যাসাইনমেন্ট সলভ করে গেছে। ক্লাস শেষের পরে ছুটেছে টিচারদের পিছু পিছু, ডাউট ক্লিয়ার করতে। ক্লাসমেটরা পেছনে টিটকিরি দিয়েছে, টপার হওয়ার জন্য কত কায়দাবাজি। সেসব চুপচাপ শুনে গেছে ও। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত টপার হয়েছে তো।
তবু স্বপ্নগুলো কেমন শুধু স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল।
অটো থেকে নেমে স্টেশনে ঢুকল ও। বোর্ডে দেখল, তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে ডাউন চার্চগেট লোকাল।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। কোনোরকমে দৌড়ে গিয়ে উঠল নিখিলেশ, দুটো উটকো লোককে ঠেলে সরিয়ে। মুহূর্তের জন্য নিজেকে বিজয়ী মনে হয় ।
যদিও সিট নেই। না থাক, কিছু যায় আসে না। দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল ও। এখানে এলে তবু একটু হাওয়া পাওয়া যায়।
আবার চিন্তাগুলো ফিরে আসে। সত্যি, চাকরিটা কালই ছেড়ে দিতে পারে নিখিলেশ। ওর অনেক বন্ধু, বন্ধু না বলে ক্লাসমেট বলাই ভালো, ইউএসএ চলে গেছে জি আর ই দিয়ে। কলেজের মেরিট লিস্টে তাদের নাম ওর থেকে নিচেই থাকত। ও-ও চলে যেতে পারে, এই ভিড়-ধাক্কাধাক্কি-ডেলি প্যাসেঞ্জারি-বসের রাগী মুখ--এসব থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যেতে পারে।
ফোন বাজছে। বাবা।
-“হ্যালো”।
- ‘আপনার কলটি হোল্ডে আছে। দয়া করে লাইনে থাকুন...’
পুরনো নোকিয়া ১২০০ টা খারাপ হয়ে যাওয়াতে বাবাকে একটা স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল নিখিলেশ। গ্যালাক্সি এস্‌ টু। বুঝিয়ে এসেছিল, কিভাবে টাচস্ক্রিনে আঙ্গুল দিয়ে নাম্বার টাইপ করতে হবে, কিভাবে ফোন ধরতে বা কাটতে হবে। তখন হ্যাঁ হ্যাঁ করে গেছিল বাবা। কিন্তু ফিরে আসার পর ও বুঝেছিল, বাবা মোটেই ব্যাপারটা রপ্ত করতে পারেনি। যদিবা নম্বর ডায়াল করতে পারে কোনোভাবে, ও এদিক থেকে কল রিসিভ করলেই হোল্ডে রেখে ফেলে; কখনো কেটেই দেয়। এইবার যাওয়া হল না, পরেরবার যখন যাবে তখন একটা নোকিয়া কিংবা স্যামসাং-এর বেসিক ফোনই দিয়ে আসবে। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল।
কেটে দিয়ে নিজেই ফোন করল নিখিলেশ। বারকয়েক রিং হওয়ার পর ধরতে পারল বাবা।
-“ হ্যাঁ, ভুল হয়ে গেছিল”, বাবা অল্প হাসল। “কবে আসছিস?”
-“এবার যাওয়া হচ্ছে না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল বাবা। শেষে একটু গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল, “ তাহলে এবার আসছিস না”।
আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু দমকে কাশি শুরু হল।
এই কাশি চেনে নিখিলেশ। কতক্ষণ কাশির সঙ্গে কতটা রক্ত উঠে আসবে, সেটাও জানে।
কিছুক্ষণ ধরে শুনল ও। তারপর কেটে দিয়ে পকেটে রাখল ফোনটা। বাইরে তাকাল। সান্তাক্রুজ ষ্টেশন।
একটু বেশিই ভেবে ফেলছিল ও। প্লেনের টিকিটটা যখন ক্যানসেল করবে, সেইসঙ্গে অ্যাপোলো হসপিটালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট-টাও ক্যানসেল করে দিতে হবে। দেখতে হবে আবার কবে ডেট পাওয়া যায়। সেইমত আবার ছুটির অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে দাঁড়াতে হবে বসের কাছে। অন্যসব কিছু বাদ দিলেও, শুধুমাত্র বাবার চিকিৎসাটা চালিয়ে যাওয়ার জন্যেই ওকে চাকরিটা করে যেতে হবে।
সান্তাক্রুজ পেরিয়ে খার রোড। খার রোড পেরিয়ে বান্দ্রাতে যখন ঢুকছে ট্রেন, তখন একটা দৃশ্য দেখে নিখিলেশ অবাক হয়ে গেল। একটু ভেবে শেষে বান্দ্রা স্টেশনেই নেমে পড়ল ও। ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে লাইন বরাবর কিছুটা হেঁটে গেল উল্টোদিকে। হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছে। লাইন থেকে কিছুটা দূরেই মাহিম ওরফে মিঠি নদী। নদী না বলে ড্রেন বলাই ভালো। শহরের সমস্ত আবর্জনা নিয়ে অনিচ্ছায় বয়ে চলেছে। সেই মিঠির ধারে, একজোড়া জং-ধরা ফেলে-দেওয়া ট্রেনের চাকার পাশে নিতান্তই অনাদৃতভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা কাশফুলের গাছ।
রাস্তা ছেড়ে এগিয়ে গেল নিখিলেশ। হাত দিয়ে মুঠো করে ধরল কাশফুলগুলোকে। পরিচিত নরম অনুভূতি।
জায়গাটায় লোকজন তেমন কেউ নেই। কিছুদূর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে মিনিট দুয়েক পরপর। কামরা থেকে যাত্রীরা অবাক হয়ে ভাবছে, একটা ছেলে এই জায়গায় একা দাঁড়িয়ে কি করছে?
কিন্তু মিঠি নয়; নিখিলেশ আসলে দেখতে পাচ্ছিল ওদের গ্রামের হলদি নদীকে। হলদির ধারে সবুজ মাঠ, নীল আকাশ, মাঠে কাশফুলের বন- সব পরিষ্কারভাবে চোখে ভেসে উঠছিল ওর। এইসময় একটা তাজা গন্ধ উঠে আসে মাঠের বুক থেকে। সেই সতেজ গন্ধটাও অনুভব করতে পারছে ও। ছোটোবেলায় ওরা বলত, পুজোর গন্ধ।
এবিএন ফাইন্যান্সের তৈরি হতে থাকা মাল্টিস্টোরিড অফিস বিল্ডিংটার পেছনে যখন সূর্য ডুবে গেল, তখনো ও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

No comments:

Post a Comment