স্থবিরতার কাব্য

প্রস্তরমানুষ আমি, বুকে গাঁথা হয়
রক্তিম শিলালিপি, বয়ে যায় অনন্ত সময়
প্রতীক্ষায়

Saturday, July 11, 2026

 আমার দাদির একটা নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর গান বাজানো যাবে না।
কেন জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “জ্বিন আসে।” আমরা হাসতাম। দাদি রাগ করতেন না। শুধু 
বলতেন, “হাসনের জিনিসই ভাবো। খালি বারোটার পরে গান বাজাইয়া নাচন দিও না।”

দাদি মারা গেছেন দশ বছর হলো। আমি এখন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিকেতনে একটা স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মেশা‌ই, মুভি, নাটক বিজ্ঞাপনের গানের সুর বসাই, ভোকাল মিক্স করি। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার ভাত। এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসছি, কারণ দাদি হয়তো ঠিকই বলতেন।

আমার মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার দ্বারকিন কোম্পানির, হারমোনিয়ামটা আমার মায়ের দাদার আমলের। জিনিসটা বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফাটা, তিনটা রিড বসে গেছে। স্টুডিওর এক বংশীবাদক ঠিকানা দিয়ে বললেন, 

"নবাবপুরের গলিতে যান। সুর ঘর। করিম ওস্তাদরে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” বংশীবাদক একটু থামলেন, 
“ওস্তাদের কথাবার্তা একটু অন্যরকম। যা কয়, সব বিশ্বাস কইরেন না। আবার সব অবিশ্বাসও কইরেন না।”

নবাবপুরের সেই গলিটা এত সরু যে রিকশা ঢোকে না। ইলেকট্রিকের দোকান, তালা চাবির দোকান, তার ফাঁকে একটা দরজা, ওপরে রঙিন কালিতে হাতে লেখা সাইনবোর্ড। "সুর ঘর" প্রোপ্রাইটর: মোঃ হাসন রাজা। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা: এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।
"সব কিছু? শুধু বাদ্যযন্ত্র না। সব কিছু।" মনে মনে ভাবলাম হাসন রাজা গান বাজনা, জমিদারি সব বাদ দিয়ে এখন বাদ্যযন্ত্র রিপায়ারের দোকান দিলো!"

ভেতরে ঢুকে মনে হলো একটা বাদ্যযন্ত্রের পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকেছি। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে তার ছেড়া বেহালা, দোতারা, ভাঙা সেতার, কোনায় ময়লা জমা জীর্ন এক তানপুরা। আর মেঝেতে, জলচৌকির ওপর, সাদা লুঙ্গি আর বাসন্তী ফতুয়া পড়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে পুরু চশমা, কানে একটা হিয়ারিং এইড। ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। যে মানুষের ব্যবসাই শব্দ, তার কানে যন্ত্র।

আমার মনের কথা পড়ে ফেলার মতো করে উনি বললেন, “অবাক হইতেছো? সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুইটা শেষ। ডাক্তার কয় আর বছর দুয়েক। তারপর পুরা নীরবতা।” উনি হাসলেন। “আমি চিন্তিত না। কান বন্ধ হইলে ক্ষতি নাই। আসল শোনাটা কানে হয় না।”
“তাহলে কীসে হয়?”

“শিরায় শিরায়।” উনি নিজের বুকে টোকা দিলেন। “শব্দ জিনিসটারে তুমি কী মনে করো? শুধু কান দিয়া শোনার জিনিস! শব্দ হইলো কাঁপন। তুমি সাউন্ডের কাজ করো, তুমি দেখো না, কনসার্টে বেইজ বাজলে বুকের মইধ্যে কেমন ধুম ধুম করে? ওইটা কানে শোনো, না বুকে গিয়ে লাগে?”

আমি হারমোনিয়ামটা নামিয়ে রাখলাম। উনি ঢাকনা খুলে ভেতরে হাত দিলেন, চোখ বন্ধ করে রিডগুলিতে আঙুল বুলালেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীর নাড়ি চেক করে। তারপর বললেন, “আহারে। কতদিন কেউ বাজায় না।”

“ঠিক করা যাবে?”

“যাবে।” উনি মুখ তুললেন। “তয় একটা কথা। আমি বান্ধুম চাইরশো বত্রিশে। তোমাগো স্টুডিওর চাইরশো চল্লিশে না। রাজি থাকলে রাইখা যাও।”

আমি ভুরু কোঁচকালাম। “চার শো বত্রিশ মানে? এ ফোর ইকুয়ালস ফোর থার্টি টু? ওস্তাদ, সারা পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্রের স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ফোর ফরটি হার্টজে। ইন্টারন্যাশনাল…”

“জানি।” উনি হাত তুললেন। “উনিশশো উনচল্লিশ সাল থেইকা স্ট্যান্ডার্ড। তার আগে কী আছিল জানো?”

জানতাম না। স্বীকার করলাম।
“বত্রিশ। হাজার বছর ধইরা ৪৩২। গ্রিকরা বত্রিশে বানত, মিশরিরা বত্রিশে বানত, আমাগো ওস্তাদরা, লালন ফকিররা বত্রিশে বানত। তারপর ১৯৩৯ সালে, ঠিক যখন হিটলার দুনিয়াত আগুন দিতাছে, তখন কারা জানি ঠিক করল, না, আইজ থেইকা দুনিয়ার সব গান আট নম্বর উপরে বাজবো। হইয়া গেলো তোমাগো স্ট্যান্ডার্ড চাইরশো চল্লিশ।” উনি আমার দিকে ঝুঁকলেন। “তুমি সুরের মানুষ। তুমিই কও। যুদ্ধের মইধ্যে দুনিয়ার মানুষের এত জরুরি কাম পড়ল কেন সুর বদলানির?”

“হয়তো টেকনিক্যাল কারণ…”

“হইতে পারে।” উনি মাথা নাড়লেন। “আমি মূর্খ মানুষ, ষড়যন্ত্র বুঝি না। আমি খালি একটা জিনিস বুঝি। আট নম্বরের ফারাকটা খালি কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শইলে ধরা পড়ে। বত্রিশের গান শুনলে মনে হয় নদীর পাড়ে বইসা আছি। বৃষ্টির ঝুমঝুম, চারশো চল্লিশের গান শুনলে মনে হয় কিসের জানি তাড়া। কীসের তাড়া, জানি না, খালি তাড়া। তুমি ভাইবা দেখো, আশি বছর ধইরা গোটা দুনিয়ার মানুষ ওই তাড়ার মইধ্যে গান শুনতাছে। মোবাইলে, বড় সাউন্ড বক্সে, দোকানে, অনুষ্ঠানে সব জাগায়। সবাই খালি কয়, অস্থির লাগে, অস্থির লাগে। কেউ জিগায় না, কেন এত অস্থিরতা!”

আমি বললাম, “কিন্তু বদলাইলো কারা? কেন?”

“হুনছি অনেক কথা।” উনি রিডটা আলোয় ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন। “ইতালির এক মস্ত ওস্তাদ আছিলেন, ভার্দি সাব। অপেরার বাদশা। উনি জান লড়াইয়া গেছিলেন চারশো বত্রিশ হার্টজ বাঁচানের লাইগা। চিঠি লেখছেন, দরবার করছেন। পারেন নাই। আর এক গবেষক সাহেব বই লেখছেন, কামডা নাকি করছে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী আর আমেরিকার এক বড়লোকের ফাউন্ডেশন, মিলামিশা কইরা। মতলব আছিল মানুষরে ভিতরে ভিতরে অস্থির কইরা রাখা। অস্থির মানুষ চালানো সোজা। সত্য মিথ্যা আল্লায় জানে। আমি খালি একটা জিনিস দেখছি। যুদ্ধ থামছে আশি বছর, মানুষের ভিতরের যুদ্ধ থামে নাই। আর সেই যুদ্ধের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বাজতেছে চাইরশো চল্লিশে।”

উনি হারমোনিয়ামের রিডটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে ফিরলেন। “টেসলা সাবের নাম হুনছো না? গাড়ি না, যেই লোকে দুনিয়ারে বিজলি দিছে? সেই সাব কইয়া গেছেন, মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হইলে শক্তি, কাঁপন আর ঢেউয়ের ভাষায় ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব থেইকা ছোড যেই কণা, সেইটাও নাকি আসলে একটা কাঁপতে থাকা সুতার মত। বোঝলা কথাডা? পাথর, মাটি, তোমার হাড্ডি, এমনকি তোমার চিন্তাডাও, সবই কাঁপন। তাইলে দুনিয়াডারে কী বলা যায়?” উনি হাসলেন। 

“দুনিয়াডা একটা তানপুরা। খোদার তানপুরা। আর আমরা সবাই ওই তানপুরার এক একটা তার। এখন কও, তারের কাম কী? তারের কাম সুরে থাকা, টিউনে থাইকা বাজা। বেসুরা তার বাজতে থাকলে দুনিয়ায় শান্তি কেমনে আসবো, অশান্তি ছাড়া আর কিছু থাকবে?”

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার কথা আধপাগলের মতো, অথচ ফেলে দিতে পারছি না। পেশাগত জীবনে আমি নিজে কতবার খেয়াল করেছি, কিছু মিক্স শুনলে অকারণে ক্লান্ত লাগে।

“পৃথিবীরও একটা সুর আছে, জানো?” ওস্তাদ বলে চললেন। “জার্মান এক সাহেব মাইপা বাইর করছে। মাটি আর আসমানের মাঝখানে একটা কাঁপন সারাক্ষণ চলতাছে।"

"জ্বী এই ব্যপারে আমার জানা আছে। এটাকে বলে শুমান রেজোন্যান্স।"

"আমার ওস্তাদ কইতেন অন্য নাম।” 

উনি একটু থামলেন। "কইতেন, এইটা দুনিয়ার জিকির। সব কিছু জিকির করে, বুঝলা। পাথর করে, গাছ করে, পশুপাখি করে, আকাশ সাগর সবেই করে। খালি মানুষ নিজের কানে শুনতে পায় না।”

“আপনি শুনেছেন?”

উনি উত্তর দিলেন না। হারমোনিয়ামের একটা রিড খুলে আলোর দিকে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “সাতদিন পরে আইসো। জিনিস রেডি থাকবো।”
সাতদিন পর গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নতুন যৌবন পেয়েছে। ওস্তাদ বললেন, “শুনো।”
উনি একটা চেনা সুর ধরলেন, কিন্তু গানের কথা মনে এলো না। এবং আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না কী হলো। শব্দটা কানে ঢুকল না। শব্দটা বুকে ঢুকল। মনে হলো কেউ আমার পাঁজরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খুব পুরনো একটা তালা খুলে দিল। আমার চোখ ভিজে উঠছিল, অকারণে, এবং সেটা লুকানোর জন্য আমি মাথা নিচু করে রইলাম। জানালার কার্নিশে দুইটা চড়ুই এসে বসল। গলির কুকুরটা দরজায় এসে চুপ করে বসে পড়ল। উনি থামার পরেও ঘরটা কয়েক সেকেন্ড ধরে বাজতে থাকল।

“বুঝলা কিছু?” ওস্তাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

“এটা… এটা কী হলো?”

“কিছুই হয় নাই। খালি যন্ত্রটারে তার নিজের সুরে ফেরত দিছি।” উনি আমার দিকে তাকালেন। “তোমারে ফেরত দিছি। মানুষের শইলের সত্তর ভাগ পানি। আর পানি কাঁপনের কথা শোনে। জাপানি ডাক্তার সাব পরীক্ষা কইরা দেখছেন। পানিরে সুন্দর সুর শুনাইয়া বরফ করলে বরফের ফুলের নকশা বানালে তা হয় নিখুঁত সুন্দর। আর বিকট শব্দ, গালাগালি শুনাইয়া বরফ করলে ফুলডা হয় ভাঙা, তুবড়ানো, লন্ডভন্ড। 

এইবার হিসাবডা করো। তোমার ভিতরে সত্তর ভাগ পানি, আর তুমি সকাল থেইকা রাইত পর্যন্ত কানে কী ঢালতেছ এই ঢাকা শহরে? হর্ন, ঝগড়া, মিটিংয়ের চিল্লানি, ব্রেকিং নিউজ, মিটিং, মিছিল। ভিতরে রোজ কী জমতেছে, সুন্দর নকশা না ভাঙন? তুমি এতক্ষণ সঠিক সুরে কাঁপলা। এই প্রথম, হয়তো বহু বছরে। এইজন্যই চোখে পানি আইছে। পানি পানিরে চিনছে।”

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক না থাকুক। ওস্তাদ চা খাওয়াতেন আর কথা বলতেন। সেই কথাগুলি আমি লিখে রাখতাম, রাতে, মনে করে করে।
সুরাইয়ার সাথে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে।
সেদিন দোকানে ঢুকে দেখি জলচৌকিতে ওস্তাদ নেই। বসে আছে এক তরুণী, কোলে একটা বেহালা। চোখ বন্ধ, কাধ বেহালার গায়ে ঠেকানো, কি সে মলিন বিষন্ন সুন্দর সুর তাতে বাজছে সে বুঝাতে পারবো না। আমি ঢুকতেই চোখ না খুলে বললো, “বসেন। দাদাজান ওষুধ আনতে গেছেন।”

আমি বসলাম। মেয়েটা আরও মিনিট দুয়েক তার বন্ধ চোখে সুরের সাধনা চালালো। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার? দাদাজান আপনার কথা বলেন। কয়, পোলাডার কান আছে, খালি কানের ব্যবহার জানে না।”

“মানে?”

সে উত্তর না দিয়ে বেহালায় পরপর দুইটা টান দিল। “ফারাক কি, বলেন তো।”

আমি শুনলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। “একই তো লাগল।”

“এই জন্যই দাদাজান ওই কথা কয়।” সে বেহালা নামিয়ে রাখল। “প্রথমটা চাইরশো চল্লিশ, পরেরটা বত্রিশ। আপনে সারাদিন যেইটা বেচেন, আর যেইটা হারাইয়া ফেলছেন।”

মেয়েটার নাম সুরাইয়া। ওস্তাদের নাতনি, স্কুলে গান শেখায়, আর ওস্তাদের চোদ্দ পুরুষের বিদ্যার একমাত্র ওয়ারিশ।

কথার মাঝখানে গলিতে একটা রিকশা বেল বাজাতে বাজাতে গেল। সুরাইয়া এমনভাবে মুখ কোঁচকাল “শুনছেন? 
বেলটা গত সপ্তাহ থেইকা বেসুরা। কমা খানিক নাইমা গেছে। রোজ শুনি আর রোজ মেজাজ খারাপ হয়।”

“রিকশার বেলেরও সুর থাকে?”

“সব কিছুর সুর থাকে।” 
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল। “সাইনবোর্ড পড়েন নাই?”

যাওয়ার সময় সে বললো, “একটা কথা। 

দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস কইরেন না।”
আমি বললাম, “আবার সব অবিশ্বাসও করব না?”

সুরাইয়া প্রথমবারের মতো হাসল। বলল, “ভালই তো চিনছেন তারে।”

এরপর থেকে সুর ঘরে আমার যাওয়ার কারণ দুইটা হয়ে গেল। এই তথ্যটা আমি ওস্তাদকে কোনোদিন বলিনি। বলার দরকারও ছিল না। বুড়া জানে না, বুঝে না এমন কিছুই মনে হয় নাই।

সুরাইয়ার সাথে আমার সবচেয়ে বড় তর্কটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, দোকানে, ওস্তাদ তখন মসজিদে। ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আপনি স্টুডিওতে কী কী বানান?”

আমি গর্ব করে বললাম, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, আইটেম গান।

সুরাইয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি জানেন আপনি আসলে কী বানান? আপনি হিপনোটিস্ট, সুরকার সাহেব। মানুষের অজান্তে মানুষের মন চালানোর যন্ত্র বানান। খালি জানেন না।”

“বাড়ায়া বলতেছো।”

“একটা দুঃখের গান ছাড়েন, তারপর নিজেরে খেয়াল কইরেন। পাঁচ মিনিট পরে দেখবেন কাঁধটা কখন নুইয়া গেছে, মুখের হাসিটা কখন মিলাইছে, আপনি নিজেও টের পান নাই। কেউ আপনারে কয় নাই দুঃখী হন। এইটারে কী কয়? হুকুম মানা।” 

"মস্তিষ্কে ডোপামিন বইলা একটা জিনিস আছে, আনন্দের কেমিক্যাল। মাপজোক কইরা দেখা গেছে, প্রিয় গান শুনলে মগজ ঠিক ততটুকু ডোপামিন ছাড়ে যতটুকু ছাড়ে প্রেমে পড়লে। বোঝলেন? আপনার হাতের মিক্সিং কনসোলটা মানুষের মগজের কেমিস্ট্রি বদলানোর মেশিন।”

“ভালো কথা। তাতে ক্ষতিটা কী?”

“ক্ষতি?” সুরাইয়ার গলা নেমে গেল। 

“আমেরিকায় এক কনসার্টে দশটা মানুষ মারা গেছে, পায়ের নিচে চাপা পইড়া, শুনছেন? সবাই কয় ভিড়ের দুর্ঘটনা। ভিড়টা বানাইলো কে? হাজার হাজার মানুষ এক বিটে মাথা নাড়তেছিল, এক কাঁপনে শরীর দুলাইতেছিল। হার্টের তালটারে টাইনা নিজের তালে নেয়। তখন মানুষের যুক্তিবুদ্ধি কমে, নিজের উপর দখল কমে, ভিড়ের লগে মিশা যাওয়ার টান বাড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, ঢেউ হয়া যায়। আর ঢেউয়ের কোনো বিবেক নাই।” ও থামল। 

“হিটলার যুদ্ধের সময় এই বিদ্যা জানতো। মশাল, এক ছন্দের স্লোগান, এক কাঁপনে লাখ মানুষের গলা। ওই কাঁপন মানুষরে ব্যক্তি থেইকা দল বানাইতো। আর দল তখন যা করছে, একলা মানুষ জীবনেও করত না। ইতিহাস পড়েন নাই?"

"আপনার মত সবজান্তা দাদা তো আমার নাই। আমি কেমনে জানবো এগুলা।"

সুরাইয়া বলেই যাচ্ছে, দাদা নাতনির একই স্বভাব, লেকচার শুরু করলে সহজে থামে না,

"শব্দ দিয়া মানুষরে এক করা যায়, আবার শব্দ দিয়াই মানুষ ভাঙা যায়। যে জাতিরে শেষ করতে চাও, আগে তার গান নষ্ট করো। গান হইলো জাতির সবচেয়ে গভীরের শিরা।”

আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে পড়ছিল, স্টুডিওতে ক্লায়েন্ট প্রায়ই বলে, ভাই, বিটটা আরও অ্যাগ্রেসিভ করেন, মানুষ যেন বইসা থাকতে না পারে।

“তাইলে করণীয় কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “কানে তুলা দিয়া ঘুরবো?”

“না।” সুরাইয়া হাসল। “বাছবেন। মানুষ মুখে কী ঢুকাইবো দশবার দেখে, আর কানে সারাদিন যা আসে তা-ই ঢালে। পচা খাবারে পেট খারাপ হয় একদিনে, টের পাওয়া যায়। পচা শব্দে মন খারাপ হয়, সহজে টেরও পাওয়া যায় না। যেই গান শোনার পরে আপনার ভিতরটা অস্থির লাগে, রাগ রাগ লাগে, ওই গান আপনার খাদ্য না, ওইটা বিষ, যত মিঠাই লাগুক। আর যেই শব্দ শোনার পরে ভিতরটা শান্তি পায়, ওইটা ওষুধ।”

“প্রকৃতির শব্দগুলো।” ও জানালার দিকে তাকাল। “বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে। আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ মানুষরে মনে করাইয়া দেয়, সে নিজের চাইতে বড় কিছুর অংশ। খেয়াল করছেন কোনোদিন, বন, নদী, বৃষ্টি, পাখি, প্রকৃতির সব শব্দ ওই চারশো বত্রিশের ঘরের আশেপাশে? আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে। পাহাড়ে গেলে মনে হয় এতদিনে শ্বাস নিতে পারতেছি, সাগরপাড়ে গেলে মনে হয় কতদিন পরে নিজেরে খুঁইজা পাইলাম। আসলে আমরা কিছু খুঁইজা পাই না।” 

আমরা ফিরা যাই। যেই কাঁপনে আমরা বানানো, সেই কাঁপনে।”

সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার কাজ করার হাতটা বদলে গেল। কনসোলে বসলেই মনে হতো, সুরাইয়া আর তার দাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সুরের টিউন ৪৩২ এ নামিয়ে দিতাম। ক্লায়েন্ট টের পেত না।

ওস্তাদ একদিন বললেন, “আজান শুনলে বুকে টান লাগে ক্যান জানো? ওই শব্দ তুমি শুনছ জন্মের পর থেইকা, দিনে পাঁচবার। শব্দ বারবার শুনলে সে মগজের ভিতরে রাস্তা কাইটা নেয়। যত শুনবা, রাস্তা তত গভীর। সুরা ফাতিহা রোজ প্রতি নামাজে পড়ায় ক্যান? বিপদের দিন যখন মাথা কাম করবো না, তখন ওই রাস্তা দিয়াই শব্দ নিজে নিজে বাইর হয়া আসবো। আর মুসলমানের ঘরে বাচ্চা জন্মাইলে সবার আগে ডাইন কানে আজান দেয় ক্যান, কোনোদিন ভাবছ? দুনিয়ায় আইসা বাচ্চাটা পয়লা যেই শব্দ শুনবো, সেইটা যাতে ঠিক সুরে বান্ধা থাকে। মানুষের টিউনিং শুরু হয় জন্মের পয়লা মিনিটে। আরেকটা জিনিস কই, বিজ্ঞানীরা মাইপা দেখছে। বুকের ভিতর দিয়া একটা লম্বা রগ নামছে, কইলজা ছুঁইয়া, পেট পর্যন্ত। আরবি মাখরাজের কাঁপন, ধীরলয়ে তিলাওয়াতের গুনগুন, ওই রগটারে জাগাইয়া দেয়। আর ওই রগ জাগলে বুক ধীর হয়, পেট শান্ত হয়। দোয়া পড়লে বুকটা হালকা লাগে ক্যান, এতদিনে বুঝলা? এইটা খালি সওয়াব না রে ভাই। এইটা শরীর। খোদা মানুষের শইলের ভিতরেই তার নিজের কমান্ডের লাইন বসাইয়া রাখছেন।”

এই পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে, ভালোই তো, এক জ্ঞানী বুড়ার সাথে এক যুবকের আলাপের গল্প। মনে হওয়ারই কথা। আসল গল্পটা আমি ইচ্ছা করে শেষের জন্য রেখেছি।

এক বিকালে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ওস্তাদ, আপনার সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়। সব কিছু মানে কী?”
ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর উঠে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মোড়া একটা বাঁশের বাঁশি। কালো হয়ে যাওয়া, মাথায় রুপার কাজ।
“আমার ওস্তাদের ওস্তাদের ওস্তাদের… হিসাব রাখি নাই কত পুরুষ। এই বাঁশি বাজে না। মানে, আমরা বাজাই না।” উনি বাঁশিটা ছুঁলেনও না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। “জার্মানিতে একটা শহর আছে। হ্যামেলিন। সাতশো বছর আগে ওই শহরে এক বাঁশিওয়ালা আসছিলো। প্রথমে এক সুর বাজাইলো, শহরের সব ইন্দুর নদীতে গিয়া ডুবল। শহরের লোকেরা তারে ওয়াদামত টাকা দিলো না। সে তখন আরেক নতুন সুর বাজাইলো। এইবার বাইর হয়া আসলো শহরের একশো তিরিশটা বাচ্চা। ঘুমঘুম চোখে, মা বাপের ডাক, নিষেধ কিছুই কানে যায় না, খালি সুরটাই কানে যায়। পাহাড়ের ভিতরে ঢুইকা গেল। আর ফিরে নাই। মানুষ কয় রূপকথা। ওই শহরের পুরানা দলিলে ঘটনাটা লেখা আছে, তারিখসহ। এই জিনিস যে আইজও চলতেছে না তুমি কেমনে জানবা?”

উনি আমার দিকে তাকালেন। “এইবার আসল কথাটা শোনো। এক বাঁশি। ইন্দুরের লাইগা এক সুর, মানুষের লাইগা আরেক সুর। মানে বোঝো? প্রত্যেক জিনিসের একটা নিজের কাঁপন আছে, আর ওই কাঁপনটা খুঁইজা পাইলে জিনিসটারে যেদিকে ইচ্ছা টানা যায়। সাপুড়ের বীণ সাপরে টানে। মাজারের জিকির মানুষরে ঘোরায়। প্রশ্ন হইলো, সবচেয়ে উপরের সুরটা কী? যেই সুরে সব বান্ধা?”

আমি চুপ করে রইলাম।
“আল্লাহ দুনিয়া বানাইছেন ক্যামনে, কোরানে আছে। কুন ফায়াকুন। হও, আর হইয়া গেল। খেয়াল কইরো, উনি হাত দিয়া বানান নাই, মাটি দিয়া শুরু করেন নাই। শুরু করছেন একটা শব্দ দিয়া। আর শেষটা হইবো ক্যামনে তাও তো জানো? সেইটাও শব্দ। ইস্রাফিল ফেরেশতা সৃষ্টির পয়লা দিন থেইকা শিঙা ঠোঁটে লাগাইয়া খাড়াইয়া আছেন। এক ফুঁয়ের অপেক্ষায়। চিন্তা কইরা দেখো ব্যাপারটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাদক, অনন্তকাল ধইরা রেডি হইয়া আছেন, খালি হুকুম আসে নাই বইলা বাজান নাই। তাইলে দুনিয়াটা কী দাঁড়াইলো? দুই নোটের মাঝখানের একটা গান। পয়লা নোটটা বাইজা গেছে, শেষ নোটটা এখনো বাজে নাই। আমরা সবাই ওই মাঝখানের সুরটার তালেই দুলতে থাকি। এইবার বুঝলা, সাইনবোর্ডে ক্যান লেখছি এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়? সব কিছু আসলেই সুরে বান্ধা। শুরু থেইকা শেষ পর্যন্ত। এখন চিন্তা করো, ওই পয়লা শব্দটার কাঁপন কত আছিল?” 

আমি শুধুই হা হয়ে শুনছি ওনার কথাবার্তা।

ওস্তাদের গলা নেমে ফিসফিসে ঠেকল। “আমার ওস্তাদ মরনের আগে একবার, খালি একবার, ওই সুরের ষোলো ভাগের এক ভাগ খুজে পাইছিলেন। তার নিজের গলায়, বাদ্যযন্ত্রে না। আমি পাশে বসা। আমি তোমারে কসম কইরা কইতাছি, ঘরের বাতাস ভারি হয়া গেছিল, দেয়ালের চুন ঝরছিল, আর আমার মনে হইছিল আমি জন্মের আগের কোনো জায়গার কথা মনে করতে পারতাছি। তারপর ওস্তাদ থাইমা গেলেন। কইলেন, বাকিটা বাজাইলে ফেরত আসন যাইবো না।”

“ফেরত আসা যাবে না মানে?”

“মানে ওই বাচ্চাগুলার মতো।” উনি হামেলিনের দিকে ইশারা করলেন, যেন শহরটা পাশের ঘরে। “সুর যখন ডাকে, তখন যাইতে হয়। যেই সুর আমরা মানা করতে পারি না। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া চুপ হয়া নিজের জিকিরে ফিরা যায়। তখন তুমি যেই সুর বাজাইবা, সেই সুর বহুদূর যায়। এবং,” উনি থামলেন, “সব কান দুনিয়ার না।”

“জ্বীন?”

“নাম দিয়া কী করবা।” ওস্তাদ বাক্সটা বন্ধ করলেন। “যে শোনে, সে শোনে। আর যে শোনে, সে মাঝে মাঝে কাছেও আসে।”

এই ঘটনার মাস দুয়েক পরের কথা। বৃহস্পতিবার রাত। স্টুডিওতে কাজ শেষ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পথে মনে পড়ল, ওস্তাদ আমার জন্য একটা পুরনো মান্ডোলিন ঠিক করে রেখেছেন, নিতে বলেছিলেন। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ।
গলিতে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।
গলিটা নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর রাত বারোটায়ও এতটা চুপ হয় না। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে, কি যে অপূর্ব বিষন্ন সুর ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ভেসে আসছিলো।

এবং সুরটা একা ছিল না। একটা যন্ত্র বাজছিল, বাঁশির মতো, অথচ বাঁশি না। আর তার সাথে, খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসের মতো, একটা মানুষের গলা মিশে ছিল। মেয়েলি মোলায়েম গলা। খুব চেনা ধাঁচের, অথচ ধরতে পারছিলাম না কার।
আমি জীবনে বহু গান শুনেছি। পেশাই আমার শোনা। ওই সুরের সাথে কোনো কিছুর তুলনা আমি দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, সুরটা শুনে আমার একইসাথে মনে হচ্ছিল মায়ের কথা, মনে হচ্ছিল দাদির কথা, মনে হচ্ছিল এমন সব জায়গার কথা যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি অথচ চিনি। আমার পা মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। এবং তখন আমি জিনিসটা দেখলাম।

গলির ইঁদুরগুলি। ড্রেনের ধার থেকে, ডাস্টবিনের পাশ থেকে, ওরা বেরিয়ে এসেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে না। ওরা বসে আছে। সার বেঁধে, চুপ করে, সুর ঘরের দরজার দিকে মুখ করে, যেভাবে মসজিদে মানুষ সারি বেধে বসে।

সুরটা থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল। ওস্তাদ দাঁড়িয়ে। ওনার মুখ দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। উনি কাঁদছিলেন, এবং একইসাথে ওনার মুখে এমন একটা আলো, যেটার কোনো নাম আমি জানি না।
উনি আমাকে দেখে চমকালেন না। শুধু বললেন, “শুনছো?”

আমি মাথা নাড়লাম।
“কতখানি শুনছো?”

“গলির মাথা থেকে।”

উনি কী যেন হিসাব করলেন মনে মনে। তারপর বললেন, “যাও। বাড়িত যাও। দৌড়ায়া যাইবা না, হাঁইটা যাইবা, তয় পিছে ফিরবা না।” আমি ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডাকলেন, “শোনো।” আমি থামলাম, ফিরলাম না। উনি বললেন, “তোমার দাদি ঠিক আছিলেন। মুরুব্বিগো কথা ফালাইও না।”

ওইটাই শেষ কথা।
পরের শুক্রবার গিয়ে দেখি সুর ঘর তালাবন্ধ। তার পরের শুক্রবারও। পাশের দোকানদার বলল, “ওস্তাদের খবর জানি না ভাই। তয় একটা জিনিস আপনের লাইগা রাইখা গেছে।” সে ভেতর থেকে আমার সেই মান্ডোলিনটা আনলো, সাথে একটা ভাঁজ করা কাগজ।

কাগজে কাঁপা হাতে লেখা:
“সুরটা এতদিন আমি খুঁজতাম। কয়দিন ধইরা টের পাইতেছিলাম, সেই সুরটাও আমারে খুঁজে। বৃহস্পতিবার রাইতে আমরা দুইজন দুইজনরে পাইছি। চিন্তা কইরো না। যেই সুরের ডাকে হামেলিনের বাচ্চারা হাসতে হাসতে গেছিলো, সেই ডাক খারাপ কিছু হইতে পারে না। খালি আফসোস, তোমারে পুরাটা শোনাইতে পারলাম না। তোমার হারমোনিয়াম, মান্ডোলিন চারশো বত্রিশে বান্ধা। ওইটারে কোনোদিন চল্লিশে তুইলো না। রোজ বাজাইও, দুনিয়া তোমারে সারাদিন যেই সুরে বান্ধে, রাইতে ঘরে ফিরা নিজেরে নিজের সুরে টিউনে ফিরাইয়া নিও।”

সুর ঘর অবশ্য বেশিদিন বন্ধ থাকেনি।
মাস খানেক পর গলি দিয়ে যাচ্ছি, দেখি দরজা খোলা। ভেতরে জলচৌকিতে বসে আছে সুরাইয়া। দাদার জায়গায়, দাদার ভঙ্গিতে। আমাকে দেখে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল, তবে শান্ত।

“দোকান তো বন্ধ করা যাইবো না,” সে বলল, যেন আমি প্রশ্ন করেছি। “শহর ভরা বেসুরা জিনিস। কেউরে তো সুরে বান্ধন লাগবো।”
আমি অনেকদিন কথাটা জিজ্ঞেস করব করব করে করিনি। সেদিন করলাম। “সুরাইয়া। ওই রাতে যন্ত্রের সাথে একটা গলাও ছিল। মেয়ের গলা। তুমি ছিলা?”
সে বেহালার ধুলা মুছছিল। হাতটা থেমে গেল। অনেকক্ষণ পর বলল, “আমি ওই রাইতে চিটাগাংয়ে। খালার বাসায়।”

“তাহলে গলাটা কার?”

“দাদাজান একটা কথা কইতেন।” সুরাইয়া মুখ তুলল না। “সুরটা যখন কাউরে নিতে আসে, একলা আসে না। চেনা গলা ধইরা আসে। যেই গলা শুনলে মানুষ আর না কইতে পারে না। দাদাজানের কাছে মনে হয় গেছিল ওনার মায়ের গলায়। দাদাজানের মা গান গাইতেন, জানেন তো।”

তারপর সে মুখ তুলল, এবং আমার সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কাছে যেদিন আসবো, কার গলায় আসবো, ভাবছেন কোনোদিন?”

গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা বেল বাজিয়ে গেল। সেই বেসুরা বেল। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, তারপর দুজনেই হেসে ফেললাম। ভয়ের পরের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি হাসি।
এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। সুরাইয়ার সাথে আমার। প্রেমের অংশটুকু আমি ইচ্ছা করে বাদ দিলাম। কিছু সুর সবাইকে শোনাতে নেই।

শুধু এটুকু বলি, কাবিনের দিন সুরাইয়া তার দাদার সেই টিনের বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলো, “এইটা এখন আমাদের সংসারের জিনিস। শর্ত একটাই। ঢাকনা খোলা যাইবো না।” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোনোদিনই না?” সে বলেছিল, “যেদিন খোলার দিন আসবো, সেদিন আপনারে জিগানো লাগবো না। বাক্স নিজেই জানান দিবো।”

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। আমি এখনো স্টুডিওতে সারাদিন চার শো চল্লিশে অন্যের গান বাঁধি। পেট চালাতে হয়। কিন্তু রোজ রাতে বাসায় ফিরে মায়ের হারমোনিয়ামটা বাজাই। সুরাইয়া পাশে বসে গলা মেলায়। দুনিয়া আমাদের সারাদিন যে সুরে চালায়, রাতে আমরা নিজেদের নিজেদের টিউনে ফিরিয়ে নিই।

আর গত মাসে আমাদের মেয়ে হয়েছে।
হাসপাতালের কেবিনে, নিয়ম মতো, আমি ওর ডান কানে আজান দিলাম। এবং একটা আশ্চর্য জিনিস হলো। আজানের প্রথম শব্দে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল। এক সেকেন্ডে। নার্স হেসে বলল, “মাশাল্লাহ, কী শান্ত বাচ্চা।” সুরাইয়া আমার দিকে তাকাল, আমি সুরাইয়ার দিকে। 

বাচ্চাটা শান্ত হয়নি। বাচ্চাটা শুনছিল। মন দিয়ে, পেশাদার কানে শুনছিল। ওর টিউনিং হচ্ছিল, জীবনের প্রথম মিনিটে, ওর বড়দাদার ওস্তাদের কথামতো।

মেয়ের নাম রেখেছি আয়াত।
কাল রাতের কথা। শহর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই নীরবতার ভেতরে মায়ের হারমোনিয়ামের রিডটা কেঁপে উঠল। সাথে সেই বক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্র।
আর বিছানায়, ঘুমের ভেতরে, আমার এক মাসের মেয়ে সেই একই সুরে গুনগুন করে উঠল। এক চুল এদিক ওদিক না।
সুরাইয়ার হাত অন্ধকারে আমার হাত খুঁজে নিল। ও ফিসফিস করে বলল, “শুনছো?” আমি বললাম, “হুঁ।” ও বলল, “ভয় পাইছ?” আমি অনেকক্ষণ ভেবে সত্যি উত্তরটা দিলাম। “না।”
সত্যিই ভয় পাইনি। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি।

এই সব জানার পর থেকে আমার একটাই অভ্যাস বদলেছে। আমি এখন শব্দ বাছি। যেভাবে মানুষ খাবার বাছে। আপনি পেটে কী ঢালেন তার হিসাব রাখেন, ক্যালরি গোনেন, ভেজাল দেখেন। কানে সারাদিন কী ঢালছেন, তার হিসাব শেষ কবে করেছেন? যেই শব্দ শুনে ভেতরটা তেতে ওঠে, সেটা বিনোদন না, সেটা ডোজ। আর যেই শব্দ শুনে ভেতরটা শান্ত হয়, বৃষ্টি, তিলাওয়াত, মায়ের গলা, ভালো একটা গান, সেটার দাম ওষুধের চেয়ে বেশি। মহাবিশ্ব সবসময়ই কথা বলছে, সুরে চালাচ্ছে, ওস্তাদ বলতেন। প্রশ্ন হলো আমরা কী শুনছি, আর কারটা শুনছি।
তবে দাদির নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের বাসায় কেউ গান বাজায় না।
সমস্যা একটাই।
মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, সুর নিজেই আমাদের বাসায় বেজে ওঠে।
ওইটা তো আর আমার হাতে না।

সুর
উদয় রহমান
০৯/০৭/২০২৬

#udayrahman

Wednesday, May 22, 2019

Robinson Crusoe-র জীবন

ক্লাস সেভেনে রবিনসন ক্রুশো আমাদের ইংরাজী র‍্যাপিড রিডার ছিল
প্রায় বিকেল হয়ে আসা দুপুরে, স্কুলবাড়ির একতলার কোণের ঘরে ইংরাজী স্যার আমাদের রবিনসন ক্রুশো পড়াতেন সামনের মাঠের ওপর রোদ পড়ে আসত আকাশে দেখতাম এক দুটো পাখি ঘুরে ঘুরে চক্কর কাটছে একটা কুকুর অলসভাবে শুয়ে আছে মাঠের মধ্যে মাঠের শেষে গাছেদের জটলা, ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সব সার বেঁধে স্যার পড়ে শোনাতেন, কিভাবে ক্রুশো দূর জনমানবশূন্য দ্বীপে একা একা খাবার জোগাড় করছে, পানীয় জল খুঁজছে, মাছ ধরছে
সেই কিশোরবেলায় কল্পনার পাখায় ভর করে উড়তে বেশ লাগত দূরের গাছের সারির দিকে তাকিয়ে ভেবে নিতাম, এই যেন ড্যানিয়েল ডিফোর গল্পে বর্ণিত সেই নির্জন দ্বীপের জঙ্গল এর মধ্যে একটা জাহাজডুবি মানুষ এসে উঠেছে  একেবারে একলা বেচারি, সঙ্গে কোনো আত্মীয় নেই, কোনো বন্ধু নেই
স্যারের গল্পে ক্রুশো একলা ঘরকন্না করতে শিখত, একলাই কুটির বানাত, একা একাই কিছু শাকসবজি, শস্যদানা চাষ করার চেষ্টা করত তখনকার অনুভূতিপ্রবণ মনে ক্রুশোর প্রতি মায়া হত, কষ্ট হত ইস্‌, সব কেমন একা-একা!
এখন প্রতিদিন চারপাশের মানুষ, প্রায়-মানুষগুলোর স্বরূপ বুঝতে বুঝতে, সভ্য-ভদ্র মুখোশের আড়ালে তাদের ঘৃণা- বিতৃষ্ণা জাগানো বিকৃত মুখগুলো চিনতে চিনতে ক্রমাগত ক্লান্ত হয়ে যখন চুপ করে বসে থাকি, তখন ক্রুশোর প্রতি ঈর্ষা হয় ইস্‌, সব কেমন একা-একা! 

Sunday, September 9, 2018

অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে...

প্রথম যখন তাঁকে দেখি, তখন সবথেকে বেশী নজর কেড়েছিল তাঁর চোখদুটো। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি-- কথাটা আগে বইয়ের পাতায় পড়া থাকলেও, এই প্রথম দেখলাম তা বলতে কি বোঝায়। আর দেখলাম, সবসময় তাঁর চোখদুটো কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে; এই ঘরভর্তি লোক, ক্যামেরার মুহুর্মুহু flash- ঝলকানি-- এসব কিছুই সেই অবিরত অনুসন্ধানকে এক চুল বিব্রত করতে পারছে না। ্তখন আমার নবম শ্রেণী; তাঁর লেখা কবিতা সেভাবে পড়ে ওঠা হয়নি তখনও; পাঠ্যবইয়ের রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, জীবনানন্দ-- এঁদের নামই কবি হিসাবে তখন পরিচিত আমাদের কাছে। তবে তাঁর একটি উপন্যাস হাতের কাছে পেয়ে পড়ে ফেলেছি; অল্পবয়সে উপন্যাসের অন্তরের কথা তত বুঝতে না পারলেও, লেখার ধরণ মুগ্ধ করেছে আমাকে। কল্পনায় আমি দেখতে পেয়েছি কলকাতা থেকে কিছু দূরে, রেলরাস্তার ওপারের সেই শান্ত মফস্বল শহরটিকে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, জোনাকি-জ্বলা মাঠের মধ্যে একটি বাড়ি; আর সেই বাড়ির অন্ধকার দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে প্রদীপের মত একটি মেয়ে। অবাক হয়ে অনুভব করেছি, উপন্যাসের সাজানো অক্ষরগুলোর আড়াল থেকে যেন উঁকি দিচ্ছে একটি নিটোল কবিতা। এমনও লেখা যায় তাহলে! সেই উপন্যাস নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে হলেও, সাহস হয়নি; আর সময়ও ছিল অল্প। বাস্তবিকই, একটা school exhibition-এ তিনি আর কতটুকু সময় দিতে পারেন। তবুও দ্রুত সব কিছু ঘুরে দেখে শেষে যখন তিনি চলে যাবার উপক্রম করলেন, তখন সবার দেখাদেখি আমিও সই নেবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম; হাতে কোনো দামী অটোগ্রাফ-ডায়েরি নয়, খাতার পেছন থেকে ছিঁড়ে নেওয়া একটুকরো কাগজ মাত্র। কাগজটা নিয়ে তিনি স্থিরভাবে আমার দিকে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত; ওই যে বলেছিলাম, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি-- সেই চোখে। আমার মনের ভেতরের সব কথা তিনি যেন পড়তে পারছেন। তারপর কাগজটায় লিখে দিলেন-- "জয় জেঠুর সই, হারিয়ে ফেলবই।" তার নীচে সই করলেন নাম।

সেই কাগজ এখন কোথায়, সে খবর জানতে চাইলে লজ্জা পাব। কারণ, জয় গোস্বামী-র সেই মূল্যবান সই, আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। 

Saturday, March 17, 2018

ভৈরবী

ভোর হচ্ছে। মায়াবী আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে-- 'আলপনা দ্যায় আলতো বাতাস, ভোরাই সুরে মন ভোলা'।
আরেকটা দিনের শুরু-- রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যাকে বলেছিলেন, 'ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন'। দিনগত পাপক্ষয়।
'ভেবেছিলাম নিচু করবো না মাথা, তবুও ভেতরের এক কুত্তার বাচ্চা
মাঝে মাঝে মসৃণ পায়ের কাছে ঘষতে চায় মুখ
এ-সব ইয়ার্কি আর কদ্দিন হে?
শুধু বেঁচে থাকতেই হালুয়া টাইট করে দিচ্ছে
অথচ কথা ছিল, সব মানুষের জন্য এই পৃথিবী সুসহ দেখে যাবো'


তবু ভোর ক্লান্তির বার্তা দেয়না কখনো। ভোর শোনায় শুদ্ধতার সুর। ব্রাহ্মমুহূর্ত-- কথাটার মধ্যে একটা নিষ্কলুষ পবিত্রতা রয়েছে। ঋষিরা এসময় সূর্য প্রণাম করতেন--
'ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশ্যং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্‌
ধ্বন্তারিং সর্ব্বোপাপোঘ্নং প্রণতোস্মি দিবাকরম্‌'
--জবাফুলের ন্যায় রক্তিম এই প্রভাতসূর্য, যাঁর পবিত্র দ্যুতি মন থেকে সব পাপভাব দূর করে, তাঁকে আমরা প্রণতি জানাই--
ঋষিরা আর নেই। তবে একজন মহর্ষি আছেন, থাকবেন। তাঁর বীণায় বেজে ওঠে সুর--
'নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে'
-- বার বার এই চরণ দুটি বাজতে থাকে, আর এই ভোরের শিশিরে জীবনানন্দের সবুজ ঘাসের মতই ভিজে যায় আমার দুই চোখ।
'নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান'--

এই অপার্থিব ভোরে, খুব ইচ্ছা করে, এই সদ্যোজাত আলোর শুভ্রতায় মুছে ফেলি এইসব অপমান- ব্যর্থতা-তুচ্ছতা-সংকীর্ণতা-পাপ-দুঃখের কালিমা। একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠি--'ইতি তোমার মা'-য়ের মহারাজ যেমন বলেছিলেন, 'নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত'-- তেমন একজন মানুষ। যে মানুষ বলতে পারে--
''ন মে দ্বেষরাগৌ ন মে লোভমোহঃ, মদ নৈব মে নৈব মাত্সর্যভাবঃ,
ন ধর্ম ন চ অর্থ ন কাম ন মোক্ষঃ, চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম'
-- আমার দ্বেষ বা রাগ নাই; আমার লোভ বা মোহ নাই; আমার অহঙ্কার বা ঈর্ষা নাই; আমার ধর্ম, অর্থ, কাম বা মোক্ষের তৃষ্ণা নাই; আমি পরম আনন্দ স্বরূপ সত্য সুন্দর পবিত্রতা।

জানি, ভোরের এই শুভ্র সংকল্প দ্রুত মলিন হয়ে যাবে। সময় এগিয়ে চলবে, রুক্ষ বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। সাক্ষাৎ গড়াবে সংঘর্ষে--'পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার'-- দিনশেষে আহত, ক্লান্ত, অপমানিত হয়ে ফিরে আসা, ক্ষণিক বিশ্রামের আশায়। এই যুদ্ধ জন্ম থেকেই চলছে; 'জন্মই আমাদের আজন্ম পাপ'। এই যুদ্ধের শেষ নেই, শেষ হয়না কখনো। তবু ভোর আসবে আবার। আবার আসবে সেই মুহূর্ত-- 'we live in moments, not in years'-- যেই মুহূর্তে আকাশে-বাতাসে আবার অণুরণিত হবে সেই মহাবাণী--
'শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা, আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ ।
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্‌, আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ
ত্বমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি, নান্যঃপন্থা বিদ্যতেহয়নায়'
-- 'হে বিশ্বমানব, শোনো, তোমরা অমৃতের সন্তান। সেই মহান পুরুষকে জানো, যিনি তমসা ভেদ করে জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি, মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো, অন্য পথ নাহি--'
-- আগামীকাল আবার সেই শাশ্বত ঊষালগ্নের পবিত্র স্পর্শ নতুন করে পাওয়ার জন্যই, বোধহয় আজকের দিনটা বেঁচে থাকা যায়।

Friday, March 2, 2018

ভালো লাগা কবিতাঃ আমি এই। সুনীল বসু


আমি এই। সুনীল বসু

তুমি কি করছ ভূতনাথ? লিখছ টিখছ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্যিই শুভাশিস, আমি গাড়ি কিনতে পারিনি, না করেছি বাড়ি
জননেতা কোন্‌ দূর, জনতার দৈত্যের হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছি
কলকাতা থেকে কিছু দূরে আধা পাড়াগাঁয়ে,
রাত ভোর হলে কলাগাছের পাতায় শিশির ঝরা দেখি,
ওতেই শিহরণ খেলে যায়।
সেই কবে এক রুগণ কবিতার নারীর সঙ্গে বিয়ে হয়ে অবধি  
খরচের আর শেষ নেই,
রাত্রে গিয়ে ঠায় বসে থাকি তারার বাগানে।
গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠলে বুকের মধ্যে হই হই করে শুনি
ভাস্কো দা গামার পালতোলা জাহাজের কামানগর্জন।
বিদ্যুৎ চমকালে দেখি শেক্সপীয়রের নাটকের বীভৎস বুড়ি ডাইনিদের চুল ছেঁড়াছিঁড়ি,
লম্বা লম্বা নখের বাহার।
ঘরে বসে জানি না আকাশকে কেন দেখি ভূমধ্যসাগর--  
এক এক দিন মাঘী পূর্ণিমায় দেখি সাদা ফেনায়িত প্রকাণ্ড আকাশব্যাপী রাজহাঁস--
ফেলে যায় নিটোল টলটলে সোনার ডিম।  
শুভাশিস, গাড়ি কিনতে পারিনি, করতে পারিনি বাড়ি, জননেতা হওয়া অসম্ভব।
শুধু ছোট ছোট কল্পনার লাল ইঁট গাঁথি,
আর চুরমার করি।
কিছুই হওয়া হয়নি। ট্রেনে করে আসি আর যাই।
রুগণ কবিতার-নারীর চিকিৎসায় আমি ফতুর হয়ে গেলাম। হয়তো জীবনই চলে যাবে...
তোমরা বেশ আছ! শুভাশিস, সুনন্দ, আশুতোষ...

আমি এই।  

Tuesday, February 27, 2018

আজ আগমনীর আবাহনে

(১৫/১০/২০১২)
আজ মহালয়া। দেবীপক্ষের শুভ সূচনা। আজ আগমনী।
ইস্কুলে পড়ার সময় আজকের দিনে আমরা সকালের প্রেয়ারে একটা গান গাইতাম।
প্রেয়ার হল এর ধূপের সেই মন ভালো করে দেওয়া গন্ধটা, পদ্মফুলের আধফোটা কুঁড়ি,
আর পুজোর শেষের সেই ছাপ আঁকা সন্দেশ ....
বড় হয়ে ওঠার পাকদন্ডী পথের ঠিক কোন বাঁকটায় যে সেগুলোকে হারিয়ে ফেললাম....
.........................
যাক। থাক আজ এসব কথা। আজ আর কোনো আপশোষ নয়। নয় কোনো পেয়ে হারানোর চাপা কষ্ট।
আজ হাসিমুখ। আজ কিসের দুঃখ ! আজ যে মা আসার দিন গোনাশুরু ! জানি, আরো সাত সাতটা দিন। তবে, এও জানি, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
একটা বছর ধরে অনেক তো হলো এসাইনমেন্ট, মিড সেমিস্টার আর প্রোজেক্ট রিপোর্ট। অনেক হলো। অনেক শিখলাম, অনেক জানলাম। জানলাম কত কিছু এখনো শেখা বাকি। কটাদিন এখন থাক না ওসব।
এবার ঘরে ফিরব।
মা ডাকছেন যে।
ঘরেতে মৃন্ময়ী মা, মন্ডপে চিন্ময়ী মা। তবে আমাদের মৃন্ময়ীতেই চিন্ময়ী।
গানটার কথা বলছিলাম না? গান তো নয়, ওটা একটা ছবি। ক্লাস সিক্স এর সুনীতি স্যার এর ভাষায়, চিত্রকল্প।
প্রার্থনাগৃহের বাটে আমার পায়ের চিহ্ন অনেকদিন পড়েনি। হারমোনিয়াম এর রিডগুলো বহুদিন ব্যবহার না হতে হতে অকেজো।
বাঁশি বাজাতে....জানতাম নাকি? মনে পড়েনা।
কিছুই মনে পড়েনা।
গানটা কিন্তু, আজও মনে আছে।
ওই গানটা ছাড়া দুগ্গা পুজো ভাবতে পারি না। যখন তখন দিনদুপুরে অকাল আঁধার, বুক-কেমন-করে-ওঠা বিজলী-উজল আলো, আর কারণে অকারণে অঝোরধারায় জনমদুখিনি মেঘবালিকার চোখের জল ---
দিনের পর দিন মন-খারাপ-করা বিকেলগুলোতে ঘরে বসে বসে যখন চন্ডীদাস এর বিলাপ এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে থাকি, তখন হঠাৎ একদিন সকালে অস্কার ওয়াইল্ড এর গল্পের মত জানালা দিয়ে দেখি, আরে ! কান্না থেমে গেছে , বদলে নরম সাদা কাশফুল গুলোর পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সকালবেলার মিঠে সূর্য। এই সুন্দর গন্ধটা শিউলির না ! গাছটা কোনদিন যে ফুলে ফুলে ভরে উঠলো, খেয়ালই করিনি ! মাঠে মাঠে সোনারঙের ধানগুলো কি এক আনন্দে মাথা দুলিয়েই চলেছে...
আর, তখনই গানটা মনে পড়ে যায়।
এক বুক আনন্দ নিয়ে দেখি, রাঙামাটির পথ বেয়ে অচিনগাঁয়ের বাউল ওই গানটাই গেয়ে গেয়ে ফিরছে......
আজ আগমনীর আবাহনে কি সুর উঠেছে বেজে
দোয়েল শ্যামা ডাক দিল তাই বরণের এয়ো সেজে ৷
ভরা ভাদরের ভরা নদী কুলুকুলু ছোটে নিরবধি
সে সুর গীতালি দেয় করতালি নাচে তরঙ্গ দোলনে রে ৷
পূরব দীপক আরতির দীপ শত ছটা মেঘ জালে
দিকবালা তায় আলতা গুলেছে রক্ত-আকাশ থালে ৷
ঘাসের বুকেতে শিশির নীর ধোয়াবে ও রাঙ্গা চরণ ধীর
সবুজ আঁচলে মুছে নেবে বলে ধরণী শ্যামলা সেজেছে রে........
সবাইকে জানাই শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা....৺আনন্দময়ীর আগমনে বিশ্বমানবের জীবন হয়ে উঠুক আনন্দমুখর....এই একান্ত প্রার্থনা ।

Sunday, February 25, 2018

কিশোরী আমোনকরের প্রয়াণে

(০৫/০৪/২০১৭)

ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখি আকাশের মুখ থমথমে, যেন উদ্গত অশ্রু চেপে রেখেছে। নিউজফিড খুলে দুটো খবর পাই। প্রথম খবর, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাসে মারা গেছে অন্ততঃ ৭২ জন। ১১টা বাচ্চা আছে তাদের মধ্যে, যারা গ্যাসের মারণ ছোবলে ছটফট করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। পৃথিবী তার সমস্ত সৌন্দর্য-শ্যামলিমা -সৌকর্য নিয়ে তাদের বড় হয়ে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তার আগেই তারা জেনে গেল বিশ্বের তথাকথিত শ্রেষ্ঠ প্রাণীটি সময় বিশেষে কতটা ঘৃণ্য, কতটা নির্মম হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয় খবর, কিশোরী আমোনকর মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল জানতাম, তবে অসুস্থতার তেমন কোনো খবর শুনিনি, ফলে সংবাদটি হজম হতে একটু সময় লাগে। গুণী চলে যান, তাঁর গান রয়ে যায়। ইউটিউবে খুঁজে পাই তাঁর সুর, কানে বাজতে থাকে চিরপরিচিত অথচ চিরনতুন সেই মল্লার-বন্দিশ —
“উমড় ঘুমড় গরজ গরজ 
বরষণ কো আয়ো মেঘা 
এইসো হি ঝনন লাগে 
পিয়া বিন মোরে নয়না ...”
ঠিক তখনই, আবহমান কাল ধরে চলে আসা মানুষের সমস্ত সঙ্কীর্ণতা, নির্মমতা, অবিচারের প্রতি অব্যক্ত বেদনা নিয়ে একফোঁটা জল আকাশ থেকে ঝরে পড়ে। আমি বুঝতে পারি, এই পৃথিবী আর কিশোরী আমোনকরদের বাসযোগ্য ছিল না।