স্থবিরতার কাব্য

প্রস্তরমানুষ আমি, বুকে গাঁথা হয়
রক্তিম শিলালিপি, বয়ে যায় অনন্ত সময়
প্রতীক্ষায়

Saturday, March 17, 2018

ভৈরবী

ভোর হচ্ছে। মায়াবী আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে-- 'আলপনা দ্যায় আলতো বাতাস, ভোরাই সুরে মন ভোলা'।
আরেকটা দিনের শুরু-- রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যাকে বলেছিলেন, 'ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন'। দিনগত পাপক্ষয়।
'ভেবেছিলাম নিচু করবো না মাথা, তবুও ভেতরের এক কুত্তার বাচ্চা
মাঝে মাঝে মসৃণ পায়ের কাছে ঘষতে চায় মুখ
এ-সব ইয়ার্কি আর কদ্দিন হে?
শুধু বেঁচে থাকতেই হালুয়া টাইট করে দিচ্ছে
অথচ কথা ছিল, সব মানুষের জন্য এই পৃথিবী সুসহ দেখে যাবো'


তবু ভোর ক্লান্তির বার্তা দেয়না কখনো। ভোর শোনায় শুদ্ধতার সুর। ব্রাহ্মমুহূর্ত-- কথাটার মধ্যে একটা নিষ্কলুষ পবিত্রতা রয়েছে। ঋষিরা এসময় সূর্য প্রণাম করতেন--
'ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশ্যং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্‌
ধ্বন্তারিং সর্ব্বোপাপোঘ্নং প্রণতোস্মি দিবাকরম্‌'
--জবাফুলের ন্যায় রক্তিম এই প্রভাতসূর্য, যাঁর পবিত্র দ্যুতি মন থেকে সব পাপভাব দূর করে, তাঁকে আমরা প্রণতি জানাই--
ঋষিরা আর নেই। তবে একজন মহর্ষি আছেন, থাকবেন। তাঁর বীণায় বেজে ওঠে সুর--
'নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে'
-- বার বার এই চরণ দুটি বাজতে থাকে, আর এই ভোরের শিশিরে জীবনানন্দের সবুজ ঘাসের মতই ভিজে যায় আমার দুই চোখ।
'নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান'--

এই অপার্থিব ভোরে, খুব ইচ্ছা করে, এই সদ্যোজাত আলোর শুভ্রতায় মুছে ফেলি এইসব অপমান- ব্যর্থতা-তুচ্ছতা-সংকীর্ণতা-পাপ-দুঃখের কালিমা। একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠি--'ইতি তোমার মা'-য়ের মহারাজ যেমন বলেছিলেন, 'নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত'-- তেমন একজন মানুষ। যে মানুষ বলতে পারে--
''ন মে দ্বেষরাগৌ ন মে লোভমোহঃ, মদ নৈব মে নৈব মাত্সর্যভাবঃ,
ন ধর্ম ন চ অর্থ ন কাম ন মোক্ষঃ, চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম'
-- আমার দ্বেষ বা রাগ নাই; আমার লোভ বা মোহ নাই; আমার অহঙ্কার বা ঈর্ষা নাই; আমার ধর্ম, অর্থ, কাম বা মোক্ষের তৃষ্ণা নাই; আমি পরম আনন্দ স্বরূপ সত্য সুন্দর পবিত্রতা।

জানি, ভোরের এই শুভ্র সংকল্প দ্রুত মলিন হয়ে যাবে। সময় এগিয়ে চলবে, রুক্ষ বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। সাক্ষাৎ গড়াবে সংঘর্ষে--'পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার'-- দিনশেষে আহত, ক্লান্ত, অপমানিত হয়ে ফিরে আসা, ক্ষণিক বিশ্রামের আশায়। এই যুদ্ধ জন্ম থেকেই চলছে; 'জন্মই আমাদের আজন্ম পাপ'। এই যুদ্ধের শেষ নেই, শেষ হয়না কখনো। তবু ভোর আসবে আবার। আবার আসবে সেই মুহূর্ত-- 'we live in moments, not in years'-- যেই মুহূর্তে আকাশে-বাতাসে আবার অণুরণিত হবে সেই মহাবাণী--
'শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা, আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ ।
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্‌, আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ
ত্বমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি, নান্যঃপন্থা বিদ্যতেহয়নায়'
-- 'হে বিশ্বমানব, শোনো, তোমরা অমৃতের সন্তান। সেই মহান পুরুষকে জানো, যিনি তমসা ভেদ করে জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি, মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো, অন্য পথ নাহি--'
-- আগামীকাল আবার সেই শাশ্বত ঊষালগ্নের পবিত্র স্পর্শ নতুন করে পাওয়ার জন্যই, বোধহয় আজকের দিনটা বেঁচে থাকা যায়।

No comments:

Post a Comment