স্থবিরতার কাব্য

প্রস্তরমানুষ আমি, বুকে গাঁথা হয়
রক্তিম শিলালিপি, বয়ে যায় অনন্ত সময়
প্রতীক্ষায়

Saturday, February 24, 2018

এত তু ব্রুতি

(২১/০১/২০১৮)

আপনারা অনেকেই জানতে চেয়েছেন
, ঠিক কি হয়েছিল। বলছি।
সন্ধ্যেবেলা,
ক্লান্তদেহে বাড়ি ফিরলাম। 
দেখি বন্ধু বসে আছে। মুখে অপরাধী হাসি।
এতদিন পরে দেখা, তবু দেখামাত্র মাথায় রক্ত চড়ে গেল। 
কর্কশকণ্ঠে জিগ্যেস করলাম
কি ব্যাপার? বাইরে বড় করে লেখা দেখিসনি—‘মানুষ প্রবেশ নিষেধ’?
ও হাসলপাঁচিল টপকে ঢুকেছি। তোর গেটে তো সবসময়ই তালা। 
আমার মনে পড়ে গেল, বৃদ্ধ রাজমিস্ত্রি বলেছিল বটেবাবু, সাইনবোর্ডে কাজ হয়না। 
জন ঠিকভাবে পড়তে জানে?
কাঁটা লাগান, ভাল কাঁটা এনে দিতে পারি আমি
খুব আন্তরিকভাবে বন্ধু জানতে চাইলতারপর, কেমন আছিস বল?
স্থির চোখে চেয়ে আমি ওকে বললাম
এখানে কোন ধান্ধায়? ধান্ধাবাজি আগের মতই চালাচ্ছিস নিশ্চয়ই?
লোকের নিন্দে, সুযোগ পেলেই পিছনে লাগাএসব ছাড়িসনি তো
আহত গলায় ও উত্তর দিল
কেন এসব বলছিস? আমি আর সেরকম নেই। তখন বয়েস কম ছিল
দাঁতে দাঁত চেপে আমি বললাম, তোদের আবার বয়েস বাড়ে নাকি
তোরা শুধু বুড়ো হোস, আর মরে যাস। 
ও খুক খুক করে কাশছে। কাশতে কাশতেই বলল, এখন অনেক বদলে গেছি রে। 
কিরকম বদলেছিস? কারো ভালো দেখলে চোখ টাটায় না আর
যা হোক করে তাকে টেনে নামাতে আর জান লাগাস না
বন্ধু মাথা নীচু করে আছে। 
আমার কথাগুলো ওকে বেশ আঘাত দিচ্ছে, যা বুঝলাম। না, কষ্ট নয়; আমার তৃপ্তি হল।
আর মেয়েবাজি? অবশ্য মেয়ে নয়, তোর কাছে তো সবই মাল, কি বলিস
তোলো আর ছাড়ো, অ্যাঁ? মনে আছে সেসব
ও মুখ তুলল। ওর দুচোখে কি জল? অনুশোচনার অশ্রু
পাত্তা দিলাম না।
আমি অনেক টায়ার্ড। কি চাস সেটা জলদি বল।
বন্ধু মুখ খুলল কিছু বলবার জন্য, কিন্তু আবার কাশির দমক এল একটা। 
কোনো শক্ত অসুখে ভুগছে নাকি
ওর চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। 
কাশতে কাশতে কাতরভাবে ও বললএকটু জল খাওয়াবি
ওর মুখে সত্যিই আমি কেমন একটা তৃষ্ণার ছায়া দেখতে পেলাম। 
এবং, এই প্রথম, এক মুহূর্তের জন্য
আমার মনে আবার করুণার উদয় হল।
আমি জল আনতে পিছনে ফিরলাম
তৎক্ষণাৎ আমার কানে ভেসে এল ইস্পাতে-ইস্পাতে ঘর্ষণের তীক্ষ্ণ জান্তব শব্দ। 
তার পরের ঘটনা আপনারা সবাই জানেন; পোস্টমর্টেম রিপোর্টে যেমনটা লেখা ছিল
এ ক্লিয়ার কেস অফ ব্যাকস্ট্যাবিং

বালিকার সম্পর্কে ঘোষণা

(১২/১১/২০১৭)

আমার বালিকাটি আজ হারাইয়া গিয়াছে। লুকোচুরি ছিল তার প্রিয় খেলা
, অনুমান করি খেলিতে খেলিতে সে এত দূরে গিয়া পড়িয়াছে যে আর ফিরিতে পারে নাই। যে বালিকার কলধ্বনিতে একদা ভোরের আলো ফুটিত, সজল বাতাস বহিত এবং অপরাজিতায় নীল ও দূর্ব্বাঘাসে সবুজ রঙ ধরিত, আজ সে কোথাও নাই। হয়তো ইহাই পৃথিবীর নিয়ম। যেমনটি মহাকবি বলিয়াছেন--"ঝরে গেছে বলে তারে ভুলে গেছে নক্ষত্রের অসীম আকাশ, কোথাও সে নাই আর। তবু বালিকার জন্য মধ্যে মধ্যে মন বড় উন্মনা হইয়া উঠে। ইহাও অবশ্য পৃথিবীরই নিয়ম। তাই কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাহাকে খুঁজিয়া পান, তবে দয়া করিয়া সযত্নে রাখিবেন। কেননা এই পৃথিবীতে আমরা অনেকেই আছি; বালিকা কিন্তু একজনই। যদিও তাহাকে কোথায় পাইবেন বলা শক্ত। তবে যদি বৃষ্টিমুখর দিনে কাহাকেও ভিজিতে ভিজিতে আঁচল ভরিয়া বকুলফুল কুড়াইতে দেখেন, বুঝিবেন এ-ই বালিকা। যদি কোনো এক শরতে দেখিতে পান কাশফুলের বন ঠেলিয়া কেহ মনের আনন্দে ছুটিয়া যাইতেছে অনেক দূরের পানে, জানিবেন এ সে। যদি রোগশয্যায় একাকী শুইয়া জ্বরতপ্ত কপোলে সহসা কাহারো শীতল হাতের স্পর্শ পান, বুঝিবেন সে-ই আসিয়াছে। তবে যেখানেই হউক এবং যখনই হউক, তাহাকে একবার দেখিলেই চিনিতে পারিবেন
বালিকা, পরনে লালপাড় ছাপা শাড়ী, চুলগুলি কপালে আসিয়া পড়িয়াছে, হাতে কাঁচের চুড়ি এবং চিত্রবিচিত্র নকশা। ভালো করিয়া লক্ষ্য করিলে দেখিতে পাওয়া যায়, দুই গালে জলের শুকনো দাগ আছে।



ছোটবেলায়

(১২/১২/২০১৭)

ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির তিনদিকে ছিল আদিগন্তবিস্তৃত চাষের জমি। আর একপাশে কাঁচ-জলের নতুনপুকুর। শীতকালে ক্ষেত ভরে থাকত মটরশুঁটি, সরষে, আলু, আর, নয়ানজুলি-র জল পেলে, বোরো ধানে। পুকুরে শাপলা-শালুকের আড়ালে বেড়ে উঠত কালচে সবুজ পানিফলের ঝাড়। সকালে উঠে দেখতাম কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে গাছপালা। খড়ের পালুইয়ের পাশ দিয়ে এসে পড়েছে পাতলা একফালি রোদ, কিচির-মিচির করতে করতে সেই ওম মাখছে ধানচড়ুইয়ের ঝাঁক। মাঠের আল ধরে বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেলে দেখা মিলত নদীর। শীতে জল তেমন নেই, নাবাল জমিতে একের পর এক মাচানে চাষ হচ্ছে শশা। কৃষাণেরা বলত কাঁকুড়। নদীর ওপার থেকে টাটকা খেজুর রস নিয়ে আসত গাছি-রা। খেজুর গাছের গায়ে একটা ছুঁচলো সরু বাঁশডাল বিঁধিয়ে দিত ওরা, ডালের আগায় মাটির হাঁড়ি, গাছের সঙ্গে পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা। সারারাত ধরে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হত খেজুর রস, মায়ের বুক থেকে যেমন দুধ আসে শিশুর মুখে। বেলা বাড়লে সেই রস জ্বাল দিয়ে নলেন গুড় তৈরি হবে, আর অফিস-ঘন্টা পেরিয়ে ধীরেসুস্থে চলা এগারটার ট্রেনে চেপে চলে যাবে শহরে । নলেন গুড় অনেক জায়গায় পাওয়া যায়, কিন্তু সেই অপূর্ব, অনাঘ্রাত ঠাণ্ডা- মিষ্টি খেজুর রস আর কোথাও পাইনি। ধানচড়ুইয়ের মতই তা হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে।

শেষ স্বপ্ন

(২০/১১/২০১৭)

স্বপ্ন ছিল, মানুষ হয়ে মানুষের পাশে বাঁচার,
মানুষের মত করে।
আজ আমার চতুর্দিকে দেখি শুধু সরীসৃপ।
কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ বা হলুদ;
কিন্তু রক্ত সবার বরফশীতল
লকলকে চেরা জিভগুলো বেয়ে সবার গড়িয়ে পড়ছে
সবুজাভ তীব্র বিষ।

জল আনতে গিয়ে দেখি, নদী নেই,
পচে গলে যাওয়া কালো পাঁকের মধ্যে কিলবিল করে সরীসৃপ।
ছায়া খুঁজতে গিয়ে দেখি, গাছ নেই,
কেটে ফেলে দেওয়া গুঁড়ির ওপর ফণা তুলে দাঁড়ায় সরীসৃপ।
বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি, ঘর নেই,
প্রেয়সীর ছেড়ে যাওয়া রাতপোশাকের ভাঁজে আজ কুন্ডলী পাকায় সরীসৃপ।
আতঙ্কে পালাতে চাই;
পালাতে যাই
খোলা ম্যানহোলের গর্ত থেকে বীভৎস হাঁ করে বেরোয় সরীসৃপ।
এক ছোবল
দুই ছোবল
তিন ছোবল

বেহুলা একলা ভেলা ভাসিয়ে সেই কবে গেছে চলে;
বুক ভর্তি বিষ নিয়ে
আজ তাই মৃত্যুর প্রহর গুনি;
মুক্তির প্রহর গুনি
বিষে নীল হই
বিষে নীল হতে হতে জীবনের শেষ স্বপ্ন দেখে যাই
এই প্রাগৈতিহাসিক শহরের বুকে নিঃশব্দে নেমে আসছে

এক আদিগন্ত রক্তিম ভিস্যুভিয়াস  

Friday, February 23, 2018

এসো, মানুষ হও

(১২/০১/২০১৮)

জন্মের ঊষালগ্নে একবার
কানে এসেছিল তোমার আহ্বান
এসো, মানুষ হও

তারপর ক্ষয়ে গেছে বহু ব্যর্থকাম আয়ু
ইতিমধ্যে আমি শিখেছি নিরর্থক বাক্যালাপ (বা নিছক শব্দদূষণ)
ধূর্ত শৃগালের চাতুর্যে রপ্ত করেছি প্রবঞ্চনা ও শঠতা
জীবনের আরো সব গুঢ় ছলাকলা
(এমনকি তোমাকে অবজ্ঞাও দেখাতে শিখেছি
কেননা তোমার নাম উচ্চারণ আমাকে অপাংক্তেয় করে তুলতে পারে)
তুমি বলেছিলে, ফল্গুধারা হও,
তোমার সাবধানবাণী হেলায় তুচ্ছ করে
আমি সরবে মূলস্রোতে মিশতে চেয়েছি

আমি তো শুনেছি তার বিদ্রূপ
গা থেকে যার ঘামের মত অর্থ আর লোভের কটু গন্ধ আসে
আমি তার চোখে গ্রহণীয় হতে চেয়েছি
তার স্বীকৃতির লোভে আমি বিসর্জন দিয়েছি নিজস্বতা
মাথায় পরেছি ভাঁড়ের টুপি
দুগালে মেখেছি উদগ্র রং
গড্ডালিকা প্রবাহের চৌম্বক আকর্ষণে
দিগ্‌ভ্রান্ত আমি এভাবেই স্বস্তি খুঁজে নিয়েছি

তবু, কোনো গভীর রাত্রে যখন একাকী নিজের পাশে শুই
সহসা এক ঝড়ের শব্দ শুনি
ক্ষিপ্রহস্তে বন্ধ করি সব অর্গল, সভয়ে মুখ গুঁজে রাখি শয্যায়
সমস্ত বারণ ঠেলে অনিবার্য ঝঞ্ঝা তবু আসে
হাহাকারে উড়ে যায় আমার সযত্নে লালিত কুৎসিত মুখোশ
আর মেঘমন্দ্র স্বরে আবার উচ্চারিত হয় সেই মহাবাণী

"এসো, মানুষ হও"

মুহূর্তে এক বিস্ফোরণ
সুতীক্ষ্ণ শলাকা যেন বিঁধে যায় বুকের শীতল পাথরে
আহত রণ-অশ্বের মত আমি এসে পড়ি রাজপথে
হৃদয়ে ঝড়ের হ্রেস্বাধ্বনি
নীলকণ্ঠের উদাত্ত আহ্বান আমার শিরায় শিরায়
ফেনিল নিঃশ্বাসে পান করে নেব পৃথিবীর সব দুঃখ যন্ত্রণা

কৃষ্ণনীল আকাশের প্রতিটি দীপ্য নক্ষত্র আমাকে ডাকেএসো, মানুষ হও
উন্মাতাল বাতাসের প্রতিটি আনন্দ লহরী আমাকে ডাকেএসো, মানুষ হও
মাতৃরূপী মৃত্তিকার প্রতিটি সহিষ্ণু বৃক্ষ আমাকে ডাকেএসো, মানুষ হও


আমি ছুটে ছুটে চলি অবিরাম

Friday, October 7, 2016

দেবীপক্ষের গল্পঃ ঘরে ফেরা

(০৭/১০/২০১৬) শেষ পর্যন্ত ছুটিটা পাওয়া গেল না।
গত এক মাস ধরে এই ছুটিটার জন্য বস্‌কে বলে আসছে নিখিলেশ। প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে ইন্ডিগোর টিকিটটা যেদিন কাটল, তার পরের দিন থেকেই। দেখছি দেখবো করে এড়িয়ে যাচ্ছিল বস্, আজ শিফট শেষে নিজের চেম্বারে ডেকে খোলাখুলি জানিয়ে দিল, হবে না।
অনেক কথা ওর মনে আসছিল, কিন্তু শেষ অবধি চুপ থেকেই বাইরে চলে এল। বলে কোনো লাভ নেই।
অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের মোড়টা পর্যন্ত হেঁটে এল নিখিলেশ। গলা থেকে ‘সি.ই.সি. কন্সট্রাকশন’ লেখা আইডি-টা খুলে ব্যাগে ঢোকাল, হাত দেখিয়ে উঠে পড়ল একটা অটোয়।
—‘ আন্ধেরি স্টেশন।’
চাকরিটা কি ছেড়ে দেবে? ভাবছিল ও। জয়েন্টে ওর যত র‌্যান্ক হয়েছিল, ওদের গ্রামে এরকম ভালো র‌্যান্ক আগে কেউ করেনি। যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এল, কত স্বপ্ন ছিল সেসময়। গ্রাজুয়েট হবে, তারপর বিদেশে যাবে, মাস্টার্স করবে; কোনো মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেটে উঁচু পোস্টে জয়েন করবে, নয়তো আরও পড়বে, কোনো ভালো ইউনিভার্সিটির স্কলার হবে—এমনটাই ভাবত ফার্স্ট ইয়ারে । শুধু স্বপ্ন দেখাই নয়, তার জন্য পড়াশোনাও তো কম করেনি। অন্যরা যখন ক্লাস পালিয়ে সিনেমা দেখতে গেছে, কিংবা শনি-রবি-সোম টানা তিনদিনের ছুটি পেয়ে বেড়াতে গেছে দীঘা, ও তখন ঘাড় গুঁজে বসে পাতার পর পাতা অ্যাসাইনমেন্ট সলভ করে গেছে। ক্লাস শেষের পরে ছুটেছে টিচারদের পিছু পিছু, ডাউট ক্লিয়ার করতে। ক্লাসমেটরা পেছনে টিটকিরি দিয়েছে, টপার হওয়ার জন্য কত কায়দাবাজি। সেসব চুপচাপ শুনে গেছে ও। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত টপার হয়েছে তো।
তবু স্বপ্নগুলো কেমন শুধু স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল।
অটো থেকে নেমে স্টেশনে ঢুকল ও। বোর্ডে দেখল, তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে ডাউন চার্চগেট লোকাল।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। কোনোরকমে দৌড়ে গিয়ে উঠল নিখিলেশ, দুটো উটকো লোককে ঠেলে সরিয়ে। মুহূর্তের জন্য নিজেকে বিজয়ী মনে হয় ।
যদিও সিট নেই। না থাক, কিছু যায় আসে না। দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল ও। এখানে এলে তবু একটু হাওয়া পাওয়া যায়।
আবার চিন্তাগুলো ফিরে আসে। সত্যি, চাকরিটা কালই ছেড়ে দিতে পারে নিখিলেশ। ওর অনেক বন্ধু, বন্ধু না বলে ক্লাসমেট বলাই ভালো, ইউএসএ চলে গেছে জি আর ই দিয়ে। কলেজের মেরিট লিস্টে তাদের নাম ওর থেকে নিচেই থাকত। ও-ও চলে যেতে পারে, এই ভিড়-ধাক্কাধাক্কি-ডেলি প্যাসেঞ্জারি-বসের রাগী মুখ--এসব থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যেতে পারে।
ফোন বাজছে। বাবা।
-“হ্যালো”।
- ‘আপনার কলটি হোল্ডে আছে। দয়া করে লাইনে থাকুন...’
পুরনো নোকিয়া ১২০০ টা খারাপ হয়ে যাওয়াতে বাবাকে একটা স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল নিখিলেশ। গ্যালাক্সি এস্‌ টু। বুঝিয়ে এসেছিল, কিভাবে টাচস্ক্রিনে আঙ্গুল দিয়ে নাম্বার টাইপ করতে হবে, কিভাবে ফোন ধরতে বা কাটতে হবে। তখন হ্যাঁ হ্যাঁ করে গেছিল বাবা। কিন্তু ফিরে আসার পর ও বুঝেছিল, বাবা মোটেই ব্যাপারটা রপ্ত করতে পারেনি। যদিবা নম্বর ডায়াল করতে পারে কোনোভাবে, ও এদিক থেকে কল রিসিভ করলেই হোল্ডে রেখে ফেলে; কখনো কেটেই দেয়। এইবার যাওয়া হল না, পরেরবার যখন যাবে তখন একটা নোকিয়া কিংবা স্যামসাং-এর বেসিক ফোনই দিয়ে আসবে। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল।
কেটে দিয়ে নিজেই ফোন করল নিখিলেশ। বারকয়েক রিং হওয়ার পর ধরতে পারল বাবা।
-“ হ্যাঁ, ভুল হয়ে গেছিল”, বাবা অল্প হাসল। “কবে আসছিস?”
-“এবার যাওয়া হচ্ছে না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল বাবা। শেষে একটু গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল, “ তাহলে এবার আসছিস না”।
আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু দমকে কাশি শুরু হল।
এই কাশি চেনে নিখিলেশ। কতক্ষণ কাশির সঙ্গে কতটা রক্ত উঠে আসবে, সেটাও জানে।
কিছুক্ষণ ধরে শুনল ও। তারপর কেটে দিয়ে পকেটে রাখল ফোনটা। বাইরে তাকাল। সান্তাক্রুজ ষ্টেশন।
একটু বেশিই ভেবে ফেলছিল ও। প্লেনের টিকিটটা যখন ক্যানসেল করবে, সেইসঙ্গে অ্যাপোলো হসপিটালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট-টাও ক্যানসেল করে দিতে হবে। দেখতে হবে আবার কবে ডেট পাওয়া যায়। সেইমত আবার ছুটির অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে দাঁড়াতে হবে বসের কাছে। অন্যসব কিছু বাদ দিলেও, শুধুমাত্র বাবার চিকিৎসাটা চালিয়ে যাওয়ার জন্যেই ওকে চাকরিটা করে যেতে হবে।
সান্তাক্রুজ পেরিয়ে খার রোড। খার রোড পেরিয়ে বান্দ্রাতে যখন ঢুকছে ট্রেন, তখন একটা দৃশ্য দেখে নিখিলেশ অবাক হয়ে গেল। একটু ভেবে শেষে বান্দ্রা স্টেশনেই নেমে পড়ল ও। ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে লাইন বরাবর কিছুটা হেঁটে গেল উল্টোদিকে। হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছে। লাইন থেকে কিছুটা দূরেই মাহিম ওরফে মিঠি নদী। নদী না বলে ড্রেন বলাই ভালো। শহরের সমস্ত আবর্জনা নিয়ে অনিচ্ছায় বয়ে চলেছে। সেই মিঠির ধারে, একজোড়া জং-ধরা ফেলে-দেওয়া ট্রেনের চাকার পাশে নিতান্তই অনাদৃতভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা কাশফুলের গাছ।
রাস্তা ছেড়ে এগিয়ে গেল নিখিলেশ। হাত দিয়ে মুঠো করে ধরল কাশফুলগুলোকে। পরিচিত নরম অনুভূতি।
জায়গাটায় লোকজন তেমন কেউ নেই। কিছুদূর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে মিনিট দুয়েক পরপর। কামরা থেকে যাত্রীরা অবাক হয়ে ভাবছে, একটা ছেলে এই জায়গায় একা দাঁড়িয়ে কি করছে?
কিন্তু মিঠি নয়; নিখিলেশ আসলে দেখতে পাচ্ছিল ওদের গ্রামের হলদি নদীকে। হলদির ধারে সবুজ মাঠ, নীল আকাশ, মাঠে কাশফুলের বন- সব পরিষ্কারভাবে চোখে ভেসে উঠছিল ওর। এইসময় একটা তাজা গন্ধ উঠে আসে মাঠের বুক থেকে। সেই সতেজ গন্ধটাও অনুভব করতে পারছে ও। ছোটোবেলায় ওরা বলত, পুজোর গন্ধ।
এবিএন ফাইন্যান্সের তৈরি হতে থাকা মাল্টিস্টোরিড অফিস বিল্ডিংটার পেছনে যখন সূর্য ডুবে গেল, তখনো ও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।